The news is by your side.

“ধূসর জীবন “

0

জানুয়ারী,১১,২০২১

সুলেখা আক্তার শান্তা

দীর্ঘদিন পঙ্গু জীবন বয়ে বেড়ায় রাজন। স্ত্রী-সন্তান কারো কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারে না সে। মালিহা স্বামী রাজনের সেবা যত্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অভাব-অনটনে সংসার চলে না। ক্ষুধায় যখন ছেলে সাজিদের মুখ মলিন হয়ে যায় স্বামী-স্ত্রী দু’জনার বুক যন্ত্রনায় মুচরে ওঠে। ছেলেটাকে অন্তত ভালো রাখতে পারলে স্বস্তির পেতাম।
আলিমুদ্দিন আর রাবেয়ার ঘরে কোন সন্তান না থাকায়। স্ত্রী রাবেয়া সন্তানের জন্য কান্নাকাটি করে। তারা সিদ্ধান্ত নেয় কোন সন্তান পেলে দত্তক নিবে। সন্ধান পায় তারা সাজিদের। সাজিদের মা-বাবা মালিহা আরা রাজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আলিমুদ্দিন বলে, রাজনকে তোমার সন্তান আমাদের কাছে দাও, ওর কোন কিছুতে অভাব থাকবে না।
মায়ের মন একথা শুনে বুক ধড়ফড় করে উঠে। মানহা কিছুতেই ছেলেকে দিতে রাজি হয় না। অভাবের সংসার ছেলে সাজিদের মুখ মলিন দেখে স্বামী-স্ত্রী দু’জনার বুক যন্ত্রনায় মুচরে ওঠে।
রাবেয়া সান্ত্বনা দিয়ে বলে মালিহাকে, তোমার যখন ছেলেকে দেখতে ইচ্ছা করবে তুমি গিয়ে দেখে আসবে। তুমি সারাক্ষণ থাকো অসুস্থ স্বামী নিয়ে ব্যস্ত। সন্তানের মুখে খাবার দিতে পারো না। সন্তান ভাল থাক মা হয়ে তা কি তুমি চাও না?
রাজন আর মালিহা ছেলে সাজিদের সুখের কথা ভেবে দিতে রাজি হয়। মালিহা বলে, আমার যখন দেখতে মন চাইবে আমি তখন দেখে আসব ছেলেকে।
তোমার যখন খুশি তুমি দেখে এসো ছেলেকে।
নিষ্ঠুর অভাব মানুষকে কত অসহায় করে তোলে। মায়ের নাড়ি ছেড়া ধন তুলে দিতে হয় অন্যের হাতে। সব সংসারে জ্বলে উঠে না সুখের আলো।
রাবেয়া বেশ ফুরফুরে সাজিদকে নিয়ে। তার ব্যস্ত সময় কাটে ছেলের খাওয়া-দাওয়া করানো, ঘুম পাড়ানো, ছেলেকে ভালো ভালো কাপড় পরানো, এসব নিয়েই দিন চলে যায় তার। ছেলের মুখে যেভাবে হাসি ফুটিয়ে রাখা যায়। কিন্তু শিশুমন নিজের বেদনার কথা বলতে পারেনা। এদিক-ওদিক বারবার তাকায়। মনটা তার নিজের মাকে খুঁজে ফিরে।
মালিহা ছেলেকে প্রথমবার দেখতে আসে। দেখে বিত্ত বৈভবের মধ্যে ছেলে তার পরম সুখে আছে। ছেলের সুখ দেখে মনের দুঃখ কিছুটা বিলীন হয়। রাবেয়া বেশ খাতির যত্ন করে মালিহাকে। মালিহাকে শাড়ি তার স্বামীর জন্য পায়জামা-পাঞ্জাবি। আর কিছু টাকা দিয়ে, তোমার স্বামীর চিকিৎসা করিও। রাবেয়ার এমন ভাল ব্যবহার পেয়ে মালিহা বেশ খুশি।
তোমার যখন মন চাইবে তুমি এসে ছেলেকে দেখে যেও।
মালিহা ছেলের কপালে চুমু দিয়ে। অশ্রু চেপে রেখে বলে, বুবু আমি এসে দেখে যাব।

প্রবাহমান সময়ের স্রোত। সাজিদের পড়ালেখা শেষ হয়। বাবা আলিমুদ্দিন আর মা রাবেয়ার কাছে অনেক আদর যত্নে বড় হয় সে। তাদের ভালবাসা আদর যত্নে কখনোই বুঝতে পারেনি তারা তার জন্মদাতা বাবা-মা নয়।
একদিন এক দুঃসংবাদ নিয়ে হাজির হয় মালিহা তার স্বামী মৃত্যুবরণ করেছে। বাবার লাশ মাটি দেওয়ার জন্য ছেলে সাজিদকে নিতে এসেছে। এ কথা শুনে অবাক হয় সাজিদ। তার বাবা-মা তো আলিমুদ্দিন ও রাবেয়া। এই ব্যক্তি তার বাবা হয় কি করে?
এতদিন পর রাবেয়া ছেলেকে বুঝতে চেষ্টা করে, বাবা তিনিই তোমার আসল জন্মদাতা পিতা। তার মৃতদেহের খাট নিজের কাঁধে বহন করে মাটি দেওয়া তোমার হক। সাজিদ যেয়ে বাবাকে মাটি দিয়ে আসে। স্বামীর মৃত্যুর পর মালিহা একা হয়ে যায়। রাবেয়া তা বুঝতে পেরে মালিহাকে নিজের কাছে রাখে। মালিহা স্বামীর শোক ভুলতে ছেলে সাজিদকে আশ্রয় করতে চায়।
সাজিদ বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। ময়লা হাতে তাকে স্পর্শ করতে নিষেধ করে।
রাবেয়া ব্যাপারটি লক্ষ্য করে। সে ছেলেকে বুঝায়, থাক বাবা তাতে কি হয়েছে? আমি তোমার কাপড় ধুয়ে দেব।
ওভাবে ময়লা হাতে আমার শরীর ধরতে না বলো।
মালিহা ছেলেরা এমন আচরণে কষ্ট পায় না। ভেবে নেয় ছেলেকে লালন-পালন করেনি। মায়ের আদর ভালোবাসা দিতে পারেনি। নিজেকে এই বলে সান্তনা দেয়।
আলিমুদ্দিনের শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। ভাবে কখন যেন মৃত্যুর ডাক আসে। তার আগে নিজের বিষয় সম্পত্তি ছেলের নামে দিয়ে যেতে পারি মরেও শান্তি পাব। সে কাগজপত্র ঠিক করে। ছেলে সাজিদের নামে তার সব বিষয় সম্পত্তি লিখে দেয়। আলিমুদ্দিনের মৃত্যু যেন কাছে চলে এলো। পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। স্বামীর মৃত্যুর পর রাবেয়া ভাবে ছেলেকে এবার বিয়ে করিয়ে দিবে। সংসার সে বুঝে নিক। বউ এলে আনন্দে ভরে উঠবে তার সংসার। ছেলের জন্য মেয়ে দেখা শুরু করে। উর্মিলাকে তার ছেলের বউ হিসেবে পছন্দ হয়। বউ করে নিয়ে আসে উর্মিলাকে।
রাবেয়ার অনেক স্বপ্ন নাতি-নাতনিতে ঘর হয়ে উঠবে উজ্জ্বল। রাবেয়ার বউ যেন হয়ে ওঠে তার ধ্যান জ্ঞান।
উর্মিলা লোকমুখে শুনে রাবেয়া তার আপন শাশুড়ি না। বিষয় সম্পত্তির যা আছে সবই তার শ্বশুর মাইনুদ্দিন স্বামী সাজিদের নামে লিখে দিয়েছে। তাহলে ঝামেলা কেন পোহাবে। খরচ কমাতে শাশুড়ি মালিহাকে অন্যত্র থাকার কথা বলে।
রাবেয়া বলে, এটা আমার স্বামীর বাড়ি। এখানে কে থাকবে না থাকবে সে তোমার সিদ্ধান্তে হবে না!
উর্মিলা শুরু করে দ্বিমুখী খেলা। স্বামী বলে, কেন তুমি উটকো ঝামেলা পোহাতে যাবে। তোমার মা যদি তোমার ভালো চাইতো! তাহলে সে কি তোমাকে দত্তক দিত? তোমাকে তার বুক থেকে সরিয়ে রেখেছে, সে করেছে মহাসুখ। এখন এসেছে তোমার সুখের ভাগ নিতে। তুমি কেন রাখবে তাকে?
মাকে যদি বিদায় করি তাহলে মানুষ কি বলবে!
মানুষের ভাবনা দিয়ে তুমি কি করবে? তুমি তোমার ভালোটা আগে দেখো। আমিতো স্ত্রী হিসেবে তোমার ভালো চাই।
বউয়ের হাসিমুখ দেখাতে মায়ের সঙ্গে কথা বলে, মা তুমি এখান থেকে চলে যাও।
মালিহা ছেলের মুখে এমন কথা শুনে মনে কষ্ট পায়। ঠিক আছে, বাবা আমি চলে যাব।
রাবেয়া বলে, মালিহা এখান থেকে কোথাও যাবেনা। এখানে যেকোনো সিদ্ধান্ত আমার সিদ্ধান্তে হবে। এই কথা শুনে মালিহার বুকের কষ্ট দূর হয়। বুবু আমি কারো বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। আমি চলে যাব, সবাই ভাল থাক। রাবেয়া অবাক হয়, মায়ের জন্য ছেলের কোন ভালোবাসা নেই। সাজিদ মায়ের সঙ্গে তেমন একটা কথা বলে না। শুধু ব্যস্ত শ্বশুরবাড়ির লোকজন নিয়ে। উর্মিলাও মা ভাই বোন নিয়ে খুব ব্যস্ত। শাশুড়ির দিকে কোনো লক্ষ্য রাখে না। ছেলে আর বউয়ের এমন আচরণ দেখে রাবেয়া আত্মগ্লানিতে হতাশ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। ছেলের সাজিদকে বলে, বাবা তুই আমাকে একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবি? উর্মিলা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে, মানুষ বুড়ো হলে একটু আধটু শরীর খারাপ হতেই পারে। সেজন্য আবার ডাক্তার কিসের? দুএকদিনেই ঠিক হয়ে যাবে।
যাক আমার ডাক্তার দেখানো লাগবে না তাও তুমি চেঁচিয়েও না।
বয়সী মানুষের বিচিত্র সব ইচ্ছা। একদিন রাবেয়া ছেলেকে বলে, বাবা আমার বোয়াল মাছ দিয়ে ভাত খেতে ইচ্ছে করছে। মায়ের কথা মত সাজিদ একটি বোয়াল মাছ কিনে আনে। উর্মিলা রান্নাও করে বেশ ভালোভাবে। রাবেয়া বিছানায় শুয়েই তরকারির ঘ্রাণ পায়। তরকারি সুবাস পাচ্ছে বেশ ভালো। যাক আজ বেশ পেট ভরে ভাত খাওয়া যাবে। অপেক্ষায় থাকে খাবার আসার। এদিকে উর্মিলা মা ভাই বোন নিয়ে মত্ত। শাশুড়িকে খাওয়ানোর তার কথা মনে নেই। রাবেয়ার অপেক্ষার শেষ হয় না। খাবারের জন্য বউকে ডাকে। অবশেষে উর্মিলা শাশুড়ির জন্য ভাত নিয়ে আসে। ঝামটা মেরে বলে, এত ডাকাডাকি কিসের, রান্না করতে তো সময় লাগে। রাবেয়া দেখে তার পেটে খুদের ভাত। আর মাছ ছাড়া শুধু আলুর ঝোল। রাবেয়া অভিমানে বলে, বৌমা ভাত নিয়ে যাও, আমার এখন ক্ষুধা নেই।
এত দেমাগ কিসের? আবার জানি খেতে চায় না। এরই মাঝে সাজিদ চলে আসে।
রাবেয়া ছেলেকে বলে, বাবা দেখ, আমি তোকে বলেছি বোয়াল মাছের কথা। বউ আমাকে কি দিয়েছে শুধু ঝোলা খুদের ভাত।
সাজিদ রেগে যায়। রাগ না সামলাতে পারে উর্মিলার গায়ে হাত তুলে। সাজিদ নিজের খাবার থেকে মায়ের জন্য মাছ নিয়ে আসে।
রাবেয়া ছেলেকে বলে, বাবা তোর খাওয়ার চেয়ে কি আমার খাওয়া বড়। তুই আমাকে দিয়েছিস তাতেই আমার খাওয়া হয়েছে। তুই খা আমি দেখি, কতদিন দেখিনা তোর খাওয়া। মা আজকে আমি তোমাকে খাইয়ে দেবো। মায়ের মুখে ছেলে ভাত তুলে দেয়। ছেলের ভালোবাসা পেয়ে রাবেয়া দু’চোখের পানি ছেড়ে দেয়।

রাবেয়া ধীরে ধীরে অনেক অসুস্থ হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া বিছানাতেই হয়। শাশুড়ির প্রতি উর্মিলার অনলবর্ষী কথার বিরাম নাই। তার সেবা-যত্ন করার মতো কেউ নেই। দুর্গন্ধে কেউ রাবেয়ার কাছে যায় না। লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু কাউকে পায় না সে কাছে। রোগে ক্ষুধায় যন্ত্রণায় কাতর। হাড় জিরজিরে অবস্থা। খেতে মন চায় কিন্তু কে দেবে তাকে ভাত।
এখন তো সে মূল্যহীন বোঝা হয়ে আছে, ছেলে সাজিদকেও কাছে পায় না। সাজিদ আছে তার কাজ নিয়ে। মাকে দেখার সময় নেই তার। রাবেয়ার ময়লা-আবর্জনার মধ্যে পড়ে থাকে অসহায়ের মত।
মালিহা তার বুবুর কথা মনে পড়ে একদিন তাকে দেখতে আসে। দেখে তার বুবুর অবস্থা খুবই খারাপ। বুবু বিছানাতেই প্রসাব পায়খানা করে। মালিহা নিজের হাতে বুবুকে গোসল করিয়ে, নতুন কাপড় পরিয়ে দেয়। এরপর খাওয়া-দাওয়া করায়।
রাবেয়া ও শক্তি পেল মালিহাকে দেখে। দু’জনে মিলে সুখ-দুঃখের আলাপ করে। মালিহা বলে সাজিদকে, তোমাকে যে এত আদর যত্ন দিয়ে বড় করেছে তাকে তুমি কষ্ট দিচ্ছ! আল্লাহ তা’আলা সইবে না।
উর্মিলা বলে, আপনি কোন অধিকারে সাজিদকে ধমকাচ্ছেন?
আমি ছেলের সঙ্গে কথা বলছি, তাতে তুমি অধিকারের কথা তুলছো কেনো? ছেলেকে শাসন করতে মায়ের আবার অধিকার লাগে নাকি?
সুখে শান্তিতে থাকার জন্য ছেলেকে দিয়েছেন অন্যের কাছে। এখন এসেছেন ছেলের দাবি নিয়ে!
যার জন্য এত কথা উঠেছে তার সেবা-যত্ন করার জন্য আমি এই বাড়ী আসেনি।
যার স্বামীর এত সম্পত্তি তার হচ্ছে না চিকিৎসা। সে পারছে না কোন কিছু খেতে। তাকে সবকিছুতেই রাখা হচ্ছে অভাবে। সাজিদ কোন কথা বলছে না শুধু দাঁড়িয়ে শুনছে।
উর্মিলা বলে, তারা কর্তব্য পালন করেছেন, এখন তার জন্য সাজিদ জীবন দিয়ে দিবে নাকি?
বৌমা এ কথা বলোনা।
আপনার এই বাড়িতে আসা নিষেধ। আর যদি আপনার বুবুকে এতই সেবা-যত্ন করতে ইচ্ছা করে, আপনি তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যান।
বৌমা, বুবু তোমার কাছে বেশি হলেও আমার কাছে সে বেশি হয়নি। আমার সন্তানের জন্য সে যা করছে, যদি তাকে সেবা-যত্ন করে একটু ঋণ শোধ করতে পারি। এ যে আমার সৌভাগ্য। মালিহা তার বুবুকে নিয়ে বের হয়। যাওয়ার সময় রাবেয়া বলে, এই বাক্সের মধ্যে আমার সব অলংকার রাখা আছে এগুলো বৌমা তোমার জন্য। তাও উর্মিলার মায়া হয় না। চলে যায় মালিহা আর রাবেয়া। অন্যের আশ্রিত জায়গায় তাদের জীবনযাপন চলে। দু’জনেরই হৃদয়ে সন্তানের জন্য মায়া দূর হয় না। এক ছেলের জন্য দুই মায়ের হৃদয় করে হাহাকার। তবু তাদের একই কামনা ছেলে থাকুক সুখে শান্তিতে।

www.bbcsangbad24.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.