The news is by your side.

“অতল অশ্রু ”

0

জানুয়ারী,২০,২০২১
“সুলেখা আক্তার শান্তা”

পৃথিবীতে সবার জন্ম সার্থক হয় না। যেমন হয়নি নন্দিতার। অভাবের সংসার তার ওপর নন্দিতা প্রতিবন্ধী। বাবা আউয়াল শয্যাশায়ী অসুস্থ। টাকার অভাবে চিকিৎসা হয়না। পেটে তীব্র ব্যথার যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা চেষ্টা করে। মা আনোয়ারা ছেলের এই অবস্থা দেখে পেয়ে বাধা দেয়। মা কাতর কণ্ঠে বলে, বাবা তুই যদি এমন করিস আমার কি হবে উপায় হবে?
আউয়াল বলে, পেটের ব্যথা যে সহ্য করতে পারি না মা। দুনিয়াতে আর আমার থাকতে ইচ্ছা করে না। মরে যাওয়াই অনেক ভালো।
বাবা তোরে কষ্ট আমার যে আর সহ্য হয় না। চোখের সামনে ছেলের এই কষ্ট কোন মা কি সহ্য করতে পারে! আউয়াল মাকে সান্তনা দিয়ে বলে মা আমার দেহের যন্ত্রণা সহ্য করতে পারিনা। যন্ত্রণায় আমি দুনিয়ার মায়া ভুলে যাই।
নন্দিতা খুবই সহজ সরল একটি মেয়ে। বাবার প্রতি তার অনেক ভালোবাসা। মা তাহামিনা ছেলে মেয়ের ভাতের জন্য কান্নাকাটি থামাতে সান্তনার আশ্রয় নেয়। এইতো রান্না করছি, এইতো রান্না করছি বলে সময় ক্ষেপন করে। এ ছাড়া অন্য কোনো উপায় পায়না না। ঘরে চাউল নেই যে তা রান্না করে ছেলে মেয়ের সামনে দিবে। নন্দিতা প্রতিবন্ধী হলেও কিছুটা বোঝার ক্ষমতা তার রয়েছে। সে দেখে বাবা অসুস্থ, পরিবারে উপার্জন করার মত কেউ নেই। সে বুদ্ধি করে উপায় বের করে। পাশের খালে মাছ ধরে, হাটে নিয়ে বিক্রি করে। সেই টাকায় চাউল ডাল কিনে বাড়ি ফিরে। তাহমিনা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলে, মারে তোর এই অবস্থায়ও তুই সংসারের হাল ধরলি। তাহমিনা তাড়াতাড়ি রান্না করে ছেলেমেয়েদের খেতে দেয়। নন্দিতা সউৎসাহে প্রতিদিন নদীনালা খালবিলে মাছ ধরে। মাছ বিক্রির টাকায় কোনরকমে প্রতিদিনের খাবারের খরচ চলে। এভাবে অক্ষমের সক্ষমতায় চলতে থাকে নন্দিতাদের সংসার। তাহমিনা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নন্দিতাকে বলে, তোর শরীরের এই অবস্থাতেও তোর কাছেই পরলো সংসারের দায়িত্ব।

আউয়াল কাছে অসহ্য যন্ত্রণা চেয়ে মৃত্যুই ছিল শ্রেয়। একদিন সত্যিই মৃত্যু তাঁর কাছে এসে ধরা দেয়। বেঁচে যায় দুনিয়ার যন্ত্রণা ভোগ থেকে। মা আনোয়ারা ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়ে। পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম ঘটনা মায়ের সামনে ছেলের মৃত্যু দেখে পাথর হয়ে যায়। ছেলের সংসারের বেহাল দশায় সে আরও দিশেহারা হয়ে পড়ে। নাতি-নাতনিদের মুখে ঠিকমতো খাবার যোটানো সম্ভব হয় না। অভাব থেকে মুক্তির কোনো কুল কিনারা দেখেনা সে। শেষে ভাবে বড় দুই নাতি-নাতনিকে কোন বাড়িতে কাজে লাগিয়ে দেওয়ার কথা। মানুষের বাসায় কাজে করলে দুবেলা অন্তত খাবারটা জুটবে। সানজিদা আর তুহিনকে এক বাড়িতে কাজে লাগিয়ে দেয়। সানজিদা আর তুহিনকে কাজে দেওয়ার পর তাহামিনার সংসারে থাকে মেয়ে নন্দিতা আর ছোট দুই ছেলে তাহিন, জাহিদ আর শাশুড়ি আনোয়ারা। সুখে দুঃখে পাশে থাকা শাশুড়ি আনোয়ারার হঠাৎ একদিন মৃত্যু হয়। শাশুড়ির মৃত্যুতে তাহামিনা ভাবে দুঃখের ছায়া যেন তাকে ঘেরাও করে ধরেছে। একদিকে সংসারে অভাব অন্যদিকে স্বজন হারানোর বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তার অনুভূতি। প্রতিবন্ধী নন্দিতার আছে মৃগীরোগ। যেকোনো সময় হঠাৎ করে শুরু হয় খিঁচুনি। একদিন মাছ বিক্রি করে আসার সময় পথের মাঝে হঠাৎ করে ঝাঁকুনি দিয়ে শুরু হয় খিঁচুনি। অভাগাদের দুর্ভোগ নাকি সঙ্গেই থাকে। একটি ট্রাক এসে নন্দিতার একপা পিষে দিয়ে যায়। লোকজনের হইচই পড়ে যায়। লোকজন নন্দিতাকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে যায়। প্রাণে বেঁচে গেলেও চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায় সে। মা তাহামিনা ছুটে আসে যায়। মেয়ের অবস্থা দেখে বিলাপ করতে থাকে। মেয়েরা অবস্থা দেখে বিলাপ পারে। আল্লাহ এ কোন পরীক্ষায় ফেলেছো আমাকে। দয়াময় বেঁচে থাকার একটা পথ দেখাও। যে মেয়ে সংসারটা সচল রেখেছিল আজ সে হলো পঙ্গু। দুঃখ সইবার মত ক্ষমতা যে আমার অবশিষ্ট নেই। নন্দিতাকে কোনরকম চিকিৎসা করে বাড়ি নিয়ে আসে। নন্দিতা বিছানায় শুয়ে পরিবারের কথা ভাবে কিভাবে তাদের দিন যাবে। নন্দিতার কিবা বয়স। সবেমাত্র কৈশোর বয়স। তার উপর দিয়ে প্রবাহিত ঝড়ঝঞ্ঝার মাঝেও সংসারের প্রতি দায়িত্ব নিয়ে ভাবে।

মা দুই ভাই অনাহারে আছে। তাদের মুখের দিকে তাকানো যায়না। পঙ্গু পা নিয়ে কোন কাজও সে করতে পারবে না। নন্দিতা মরিয়া হয়ে ওঠে। জীবনের সীমাবদ্ধতা নিয়েই তাকে কিছু একটা করতে হবে। আর কিছু না হোক মানুষের দরজায় ভিক্ষা করতে পারে। অনেক চেষ্টা করে দু’টি স্ক্র্যাচ জোগাড় করে। স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে শুরু হয় তার ভিক্ষা করা। সারাদিন মানুষের দরজা ঘুরে চাউল, সামান্য কিছু পয়সা যা পায় তা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। উচ্চঃস্বরে মাকে ডাকে, মা চাউল নিয়ে এসেছি তুমি ভাত বসিয়ে দাও। তাহামিনা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। প্রতিবন্ধী পঙ্গু মেয়েটার সংসারের প্রতি অগাধ মমতা আর দায়িত্ববোধ তাকে আপ্লুত করে। বিস্মিত হয় তার অসাধ্য সাধন দেখে। মেয়ের কষ্টে মনের মধ্যে হাহাকার করে ওঠে। মারে তোর এই অবস্থায়ও তুই সংসারের কথা ভাবিস, আল্লাহ তোর সহায়ক হোক। কষ্ট ক্লিষ্ট অনামিকার মুখে তৃপ্তির রেখা ভেসে ওঠে। মা তোমাদের প্রতি আমার একটা কর্তব্য আছে না।
তুই তোর কর্তব্য পালন করে যাচ্ছিস আমরাতো তোর জন্য কিছুই করতে পারছি না।
বাবা তো ওই পাড়ে চলে গেছে। তাঁর ভালোবাসা পেলাম না। মা এ যে তোমার ভালোবাসা পাচ্ছি এটা কম কিসের।
নন্দিতা ভিক্ষা করে যে চাউল পায় তাতে কোনরকম এক বেলার খাবার হয়। তাহমিনা ভাবে পুরো দিন উপোস থাকার চেয়েও অন্ততপক্ষে একবেলা খাবার জুটছে। এটাই হাজার শুকরিয়া।

নন্দিতা যখন ভিক্ষার জন্য বের হয় তখন লক্ষ্য করে নাসির। আসা-যাওয়ার পথে নন্দিতাকে বলে নাসির, তুমি এই বয়সে ভিক্ষা করো আমার তো ভালো লাগেনা। তুমি আমার বাড়ি যাবা? আমি তোমাকে অনেক টাকা দেবো।
নন্দিতা স্বভাবসুলভ কন্ঠে বলে, আমি আপনার বাড়ি যাবো কেন? আপনি আর আমার পিছু পিছু আসবেন না। আপনি লোক সুবিধার না।
তুমি রেগে যাচ্ছ কেন? আমি কি তোমাকে কিছু বলেছি?
আমি কি আপনার মতলব বুঝিনা, আপনি কি বলতে চাচ্ছেন? আমরা গরিব হতে পারি। আমাদের সম্পদ না থাকতে পারে কিন্তু আমাদের মান সম্মান আছে। ফের আপনি আমার সামনে আসবেন না। তাহলে ভালো হবে না। নাসির কোন সুবিধা করতে না পেরে চলে যায়।
দুইদিন পর নাসির নতুন খবর নিয়ে হাজির হয় নন্দিতার সামনে। নন্দিতা তোমার এত কষ্ট আমার ভালো লাগে না। চেয়ারম্যানকে বলে তোমার পঙ্গুর কার্ড করে দেবো। নন্দিতার মন একটু নরম হয়। আপনি যদি আমাকে কার্ড করে দিতে পারেন আমার অনেক উপকার হবে।
আমি পারবো বলেই তো তোমাকে বললাম। তুমি নিশ্চিত থাকো আমি তোমাকে কার্ড করে দেবো। কার্ড করে দিলে তো নন্দিতা তোমার আমার সঙ্গে চেয়ারম্যানের কাছে যেতে হবে।
আমি যাব, আমার এই কার্ডের প্রয়োজন!
কাল তোমাকে নিয়ে যাব। তোমার সারাদিন কাজ শেষ করো, বাড়ি ফেরার পথে তোমাকে নিয়ে যাব।
আমিতো বাড়ি ফেরাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়।
তোমার চিন্তা নেই, সেই সময় তারা অবসরেই থাকে।
ভাই তখন তো সন্ধ্যা হয়ে যাবে, তখন কি ওখানে যাওয়া ঠিক হবে?
তুমি ভেবে দেখো তুমি যাবে কিনা। প্রয়োজনটা তো তোমার।
নন্দিতা ভাবে, যাক তাও ভালো যদি কার্ডটা হয়। মাসে মাসে কিছু টাকা পাব। সংসারের জন্য উপকার হবে। বড় আশা নিয়ে দেখা করে নাসিরের সঙ্গে। নন্দিতাকে নিয়ে যায় নাসির একটি নিরব বাড়িতে। বাড়িটি নিরব দেখে নন্দিতা জিজ্ঞেস করে কই এখানে তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না! আপনি আমাকে এখানে নিয়ে এলেন কেন?
দেখবে দেখবে সময় মত দেখবে। নাসিরকে খুব ভয় পেতে থাকে নন্দিতা। সে বুঝে যায় নাসির মিথ্যা কথা বলে তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। পঙ্গু ভাতার কার্ড এসব আসলে কিছুই না। নন্দিতা চিৎকার করে তাতে কোন কাজ হয়না। জনবিরল বাড়ি কোন শব্দ কার কাছে পৌঁছায় না। নাসির ধাক্কা মেরে নন্দিতাকে ফেলে দেয়। নন্দিতার কান্নাকাটি পাষাণ নাসিরের একটু দয়া হয়না। কেড়ে নেয় নারীর সম্ভ্রম পৈচাশিক আনন্দ। অসহায় নন্দিতার বিলাপে একটুও মায়া হল না নাসিরের। ইচ্ছা পূরণ করে ফেলে রেখে যায় নন্দিতাকে। নন্দিতা কোন ভাবে বাড়ি আসে। বাড়ি এসে মা বলে চিৎকার করে উঠানে পড়ে। মা তাহমিনা মেয়েকে দেখে বুঝতে পারে, সর্বনাশ হয়েছে তার মেয়ের। কান্নাকাটি করে বলে, হায়রে নরপিচাশ একটু বিবেক জাগ্রত হলো না অসহায় মেয়েটার জন্য।
নন্দিতার চাচা বোরহান, ভাস্তির এই অবস্থা দেখে প্রতিবাদ করতে যায়। খোঁজ করে মস্তান প্রকৃতির নাসিরকে বের করলেও কিছুই করতে পারে না। উল্টো নাসিরের কাছে মার খেতে হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত উপরওলার হাতে বিচারের ভার সমর্পণ করে বিরত হয় সে। নন্দিতার অবস্থা খুবই খারাপ। বাড়ি থেকে বের হতে পারে না সে। পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে না পারার গ্লানি গ্রাস করে তাকে। অসুস্থ থাকায় ভিক্ষার কাজে বের হতে পারে না সে। অনাহারে দিন যায় তাদের। অনাহারে কারণে জীর্ণশীর্ণ হতে থাকে সবাই। তাহামিনা খাবারের সন্ধানে যায়। মানুষের কাজ করে যে চাল টুকু পায় তা নিয়ে বাড়ি ফিরে। একদিন মায়ের আসতে দেরি দেখে হামাগুড়ি দিয়ে কোনভাবে চুলার কাছে যায় নন্দিতা। ঘরের যেটুকু চাল ছিল তা দিয়ে কোনরকম চুলায় বসিয়ে দেয়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। চুলার পাড়ে হঠাৎ তার মৃগীর রোগের খিঁচুনি শুরু হয়। চুলে থেকে তার কাপড়ে আগুন লেগে যায়। আগুনে নন্দিতার পুরো শরীর দগ্ধ হয়ে যায়। লোকজন ছুটে আসে। লোকজন এসে দেখে ততক্ষণে শরীর পুড়ে ঝলসে গেছে। এক সময় স্থির হয়ে যায় নন্দিতার আগুনে পোড়া দেহ। নন্দিতার মা এসে এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে আগুনে ঝাঁপ দিতে চায়। লোকজন তাকে বাধা দেয়। তাহামিনা বুক চাপড়িয়ে বলতে থাকে, মা আমাকেও তোর কাছে নিয়ে যা। আমার নন্দিতা মা এইটুকু বয়সে এই অসুস্থ শরীর নিয়ে আমার সংসারকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তার বিলাপে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। এভাবে শেষ হয়ে যায় অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়ে সংগ্রাম করা একটি মেয়ের জীবন। নিষ্ঠুর পৃথিবীর কাছে রেখে যায় অনেক অভিমান এবং অভিযোগ।

www.bbcsangbad24.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.